Saturday, September 23, 2023

বেহাল দশায় সরকারি ব্যাংকের সেবা, প্রতিকার কী?

আহসান হোসেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। প্রতিমাসে অবসর ভাতা তুলতে সেগুনবাগিচার একটি সরকারি ব্যাংকে যাতায়াত করতে হয় তাকে। আহসান হোসেনের মতে, এত বাজে ব্যাংকিং সেবা দেশের বেসরকারি খাতের ব্যাংকে দেয়া হয় না। তার মতে, ব্যক্তিগত জায়গা থেকে সরকারি ব্যাংকের সেবাগত অভিজ্ঞতা অনেকটা সরকারি হাসপাতালে সেবা নেয়ার মতোই বেহাল।

টানা এক সপ্তাহ রাজধানীর নানা সরকারি ব্যাংকে ঘুরে এবং গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, দেশের বেশিরভাগ সরকারি ব্যাংকে রয়েছে সেবাগত নানা সমস্যা। সরকারি ব্যাংক মূলত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাজ করে থাকলেও, গ্রাহক সেবার দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে আছে।

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সময় সংবাদকে বলেন, যারা সরকারি ব্যাংকে কর্মরত আছেন তাদের অনেকেরই মনোভাব রাষ্ট্রীয় বড় বড় অর্থনৈতিক কাজ ছাড়া তেমন আর কোনো কাজ করার নেই তাদের। গা ছাড়াভাবে গ্রাহকদের সেবা দেয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি বেসরকারি ব্যাংকের মূল ব্যবসার কেন্দ্রে রয়েছে তার গ্রাহক। সরকারি ব্যাংক সরাসরি গ্রাহক নির্ভর না হওয়ায়, তারা গ্রাহকদের নিয়ে এতটা ভাবেন না।

প্রতিমাসে বাড্ডার সরকারি ব্যাংকগুলোতে বিদ্যুৎ বিল জমা দিতে যান একই এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টের তত্ত্বাবধায়ক আইয়ুব আলি। তিনি বলেন, আমার পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে ব্যাংক কর্মকর্তারা পাত্তা দিতে চান না। কিন্তু আমিতো সেবা নেয়ার জন্য গেছি। অনেক সময় লাইনে দাঁড়াতে গেলেও নানা ধরণের কথা শুনতে হয়। বিলের কথা বাদ দিয়েও যদি বলি, আমরা যারা গরীব মানুষ তাদের সরকারি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলাই কঠিন। অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে ব্যাংক কর্মকর্তারা রেফারেন্স অ্যাকাউন্ট চায়। গরীব মানুষ রেফারেন্স অ্যাকাউন্ট কোথা থেকে পাবে।

একটি সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সেবা কেমন হওয়া উচিত জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং এবং ইন্সুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক হাসিনা শেখ সময় সংবাদকে বলেন,

মূলত গ্রাহক সেবা যেমন হওয়া উচিত, অর্থাৎ একজন গ্রাহক একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে যে সেবা প্রত্যাশা করে, সেটি পাওয়ার অধিকার এবং নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব সেই প্রতিষ্ঠানের। গ্রাহক সেবা নিয়ে ব্যাংকে যে নীতি এবং নিয়মকানুন আছে একটি সুষ্ঠু সেবার পরিবেশ তার মাধ্যমে সৃষ্টি করা সম্ভব।

গ্রাহককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার কথা থাকলেও সরকারি ব্যাংকগুলোতে সেবার মানের ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রত্যাশা কেন পূরণ হয় না জানতে চাইলে হাসিনা বলেন, এটি মূলত ব্যাংক কর্মকর্তাদের মানসিকতার সমস্যা। সেবার মানসিকতা থাকলে ভালো সেবা দেয়া সম্ভব। এছাড়া ব্যাংকগুলোর মানবসম্পদ বিভাগকে এ বিষয়ে আরও কাজ করতে হবে। বেছে বেছে ঠিক করতে হবে কারা ফ্রন্ট ডেস্কে বসবে এবং কারা পেছনে থেকে কাজ করবে। গ্রাহকের সঙ্গে ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে পুরস্কার এবং তিরস্কারের ব্যবস্থা রাখতে হবে। একজন ব্যাংক কর্মকর্তা যখন গ্রাহকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে পার পেয়ে যান, তিনি ধরেই নেন এটিই গ্রাহকের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ। এই ধারণাগুলো ভাঙতে এবং মানসিকতার পরিবর্তন আনতে সরকারি ব্যাংকের নির্বাহী এবং মানবসম্পদ বিভাগকে একযোগে কাজ করতে হবে।

বেসরকারি ব্যাংক সেবার মানের ক্ষেত্রে আপোষহীন উল্লেখ করে পুরান ঢাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক সময় সংবাদকে বলেন, ক'দিন আগে আমাদের কাছে অভিযোগ আসে ব্যাংকে যারা লুঙ্গি এবং গেঞ্জি পরে আসে তাদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়। অনেককে তুমি বলে সম্বোধন করেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। যাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়েছে তারা কিন্তু অভিযোগ দেননি, অভিযোগ দিয়েছেন ব্যাংকেরই অন্যান্য কিছু কর্মকর্তা। অভিযোগের ভিত্তিতে ওই ধাঁচের পোশাক পরিয়ে মানবসম্পদ বিভাগ থেকে গ্রাহক সাজিয়ে কয়েকজনকে ব্যাংকে পাঠানো হয়। এ অভিযোগের সত্যতা মিললে সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে মারাত্মক ব্যবস্থা নেয়া হয়। সরকারি ব্যাংকে প্রথমত এ ধরণের কোনো মনিটরিং নেই। অন্যদিকে একজন সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তার চাকরি হারানোর ভয় নেই বললেই চলে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তখন এদের মধ্যে কেউ কেউ স্বেচ্ছাচারী আচরণ করে।

২০১০ সালে রূপালি ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান আহমদ আল কবীর ব্যাংকটিতে নতুন নিয়ম চালু করেছিলেন। ব্যাংকটিতে গ্রাহক সংখ্যা দিনকে দিন কমতে থাকায় কর্মীদের বোনাস এবং বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে গ্রাহক আকৃষ্ট এবং অ্যাকাউন্ট খোলার বিষয়টি সংযুক্ত করায়, কয়েক বছরের মধ্যে ব্যাংকটিতে গ্রাহক সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

একটি সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তার বেতন-বোনাস গ্রাহক টার্গেটের ওপর নির্ভর করে না। মূলত এ ধরনের কোনো টার্গেট আদতে নেই। এ কারণে যে ভালো কাজ করছেন সে জানেন তার ভালো কাজের দাম নেই। যে গা ছাড়া কাজ করছেন, সেও জানেন সেই কাজের শাস্তি নেই। এভাবে চলার কারণে সরকারি ব্যাংক গ্রাহকবান্ধব হতে পারে না। মূলত শাখাগুলোকে একটি ক্যাটাগরির মধ্যে আনতে পারলে এবং কাজের দক্ষতা ও ফলাফল অনুযায়ী বেতন-বোনাস দিলে একজন ব্যাংক কর্মকর্তা তার কাজের ব্যাপারে সচেতন হবেন।

যেখানে মানুষ সরকারি ব্যাংকে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে চেয়েও খুলতে পারেন না, অ্যাকাউন্ট খুলে আবার সেবা পান না, সেখানে কর্মীদের ওপর পারফরম্যান্সের প্রেশার থাকলে তারা বাধ্য হয়ে হলেও কাজ করবে। তখন মানুষ আর সরকারি ব্যাংকের দ্বারস্থ হবে, সরকারি ব্যাংক মানুষের দ্বারে গিয়ে সেবা দেবে বলে জানান তিনি।

তবে এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, একজন গ্রাহকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা কিংবা সেবা প্রদানে উদাসীনভাব দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। কেউ যদি এমন করে থাকে, হোক সে সরকারি বা বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যবস্থা নেয়ার নিয়মনীতি রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গ্রাহক জানেন না কীভাবে অভিযোগ জানাতে হয়, তাই যেই ব্যবহারই করা হোক গ্রাহক কোনো ব্যবস্থা নেন না।

অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে তারা বলেন, সেবা পেতে গ্রাহক কোনো হয়রানির শিকার হলে শুরুতেই তিনি প্রাথমিকভাবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখা সংশ্লিষ্ট অফিসার বা শাখা ব্যবস্থাপকের নিকট মৌখিক অথবা লিখিত অভিযোগ করতে পারেন। শাখায় অভিযোগের বিষয়টি নিষ্পত্তি না হলে ব্যাংকের অভিযোগ কেন্দ্রে অভিযোগ দাখিল করতে পারবেন। সেখানেও যদি সুবিচার না পান বা গ্রাহকের অভিযোগ আমলে নেয়া না হয় সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের 'গ্রাহকস্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রে' অভিযোগ দাখিল করা যায়। অভিযোগপত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং শাখার নামসহ গ্রাহকের নাম, ঠিকানা ও ফোন নাম্বার এবং অন্যান্য প্রমাণাদিসহ অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ দাখিল করতে পারবেন।

এক্ষেত্রে অভিযোগকারী ব্যক্তি সশরীরে হাজির না হয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের হটলাইন নাম্বার, ই-মেইল বা পত্র মারফত অভিযোগ করতে পারার নিয়ম আছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: